ভূতের সাথে আড্ডা

বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। দিন দুয়েক ধরে হচ্ছে এরকম, বর্ষা এসে গেল বলে। বর্ষার সাথে সাথে আমার মধ্যে বাঙালিয়ানার বহর বেড়েছে হঠাৎ। কয়েক দিন ধরেই খুব ইচ্ছে করছে এরকম একটা দুর্যোগময় সন্ধ্যায় (এখন দুপুর) একটা ভূতের গল্পের আড্ডা দেব বন্ধুদের সাথে। এইরকম আড্ডা আজকাল বিরল হয়ে গেছে, বিশেষত এই টেকনো-হাব নিউ টাউনে কোথাও এইরকম খাস বাঙালি আড্ডা হয় কিনা আনার জানা নেই। বড় বেশি যান্ত্রিক এই অফিস পাড়াময় নিউ টাউন। হিউম্যান টাচটা পাই না। তার উপরে এখন নিউ টাউনের যেখানে থাকি, সেটা একেবারেই কলকাতার শেষপ্রান্ত। 

যাকগে, একলা চলো রে! ঠিক করে ফেললাম আজ বন্ধুদের কে ডেকে নিয়ে আড্ডা দেবই। আমি নিজের ফ্ল্যাটে একা থাকি, বাবা মা গত হয়েছেন বেশ কিছু বছর হলো আর আমি বিয়ে করিনি। অতএব কেউ মদ খেয়ে রাতে থাকতে চাইলেও অসুবিধা নেই। অন্যান্য দিন রান্নাবান্না করে খেয়ে দেয়ে লাইব্রেরী যাই লেখালিখি করতে। কিছু পত্রপত্রিকায় লেখালিখি করে আর অন্য লেখকদের বই অনুবাদ করে আমার সংসার চলে। সংসার মানে আমি আর আমার কুকুর, শান্তিগোপাল। হ্যাঁ, কুকুরের নাম রেখেছি শান্তিগোপাল। আজ লাইব্রেরি যাওয়া ক্যান্সেল করলাম। মুদির দোকানে কিছু সরঞ্জামাদি বলে দিলাম ফোনে, বিকেলের আগে দিয়ে যাবার জন্য। দোকানের থেকে আমি নিজে হাতে অনেক ভালো বানাই পকোরা, চিলি চিকেন, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই এসব। অনেকেই সেটা জানে, যারা খে���েছে তারা প্রত্যেকেই বলেছে। একা থাকতে থাকতে আর সব নিজে নিজে করতে করতে রান্নাটা ভালই জানা হয়েছে। এছাড়া ইউটিউবের সহযোগীতাও পেয়েছি। দোকানের ফোনটা কেটে একে একে বন্ধুদের লিস্ট বানাতে লাগলাম মনে মনে, কাকে কাকে ডাকব আর কাকে ডাকব না। রোহিত কে ডাকব? না। ঐ ব্যাটার সারাদিন পয়সার গল্প। প্লাস বাঙালি নয় বলে বাঙালির এইসব আমেজিয়ানা ঠিক এনজয় করে না। অবশ্য অনেক বাঙালিও আজকাল করে না। এই যে এই ভূতের গল্পের আড্ডার বন্দোবস্ত করেছি, তাই বা কতজন অ্যাপ্রিশিয়েট করবে! যাক এত শখ হয়েছে যখন একবার ট্রাই করেই দেখা যাক না! তো রোহিত কে বাদ দিয়ে ভাবলাম অবাঙালি কাউকেই ডাকব না। খাস বাঙালি আড্ডা হবে। ফোন লাগালাম আমার সবচেয়ে খাঁটি বাঙালি দোস্ত অনিন্দ্য কে। অনিন্দ্য চ্যাটার্জি খাস নর্থ কলকাতার (শ্যামবাজার) ছেলে, ওকে দিয়ে কিছু কাটলেট কবিরাজিও আনাবো। আর বাকিদের, মানে আমার হেয়ার স্কুলের গ্রুপের বন্ধুদের সাথেও ওর কন্ট্যাক্ট আছে, ও ভালো আড্ডার আয়োজন করতে পারবে। কিন্তু কি দিয়ে শুরু করব? এত বছর কোন যোগাযোগ নেই সেরম। মানে মাঝেমাঝে ফেসবুকে লাইক কমেন্ট আর হোয়াটস্যাপে ওইসব মমতা মোদি রাজনৈতিক কেচ্ছা শেয়ার বাদে। হঠাৎ করে আড্ডা দিতে ডাকব? হ্যাঁ, কেন নয়? ছেলেবেলার বন্ধু। যদিও এরা সবাই বিয়ে হয়ে গিয়ে অন্যরকম হয়ে গেছে আজকাল। অফিস আর সংসারে ব্যস্ত। যাকগে, ট্রাই করেই দেখি। "হ্যালো", "হ���যাঁ ভাই বল, ডিজিটাল জগৎ ছেড়ে বেরিয়ে এলি আজ হঠাৎ, কি ব্যাপার? মোদি আবার কি করল? এবার কি ব্যান?" "না, মোদি টোদি না" "তাহলে মমতা?" "শোন না, অনেকদিন বাদে আজকে তোদের ফোন করছি, আজকে আমার ফ্ল্যাটে চলে আয়, একটু আড্ডা দেওয়া যাবে জমিয়ে। বৃষ্টির দিন, চা সিঙ্গারা কাটলেট আর ভূতের গল্প!" হো হো করে হেসে উঠল অনিন্দ্য। "দারুণ আইডিয়া ভাই, কিন্তু আজকে তো একদম হবে না রে, মানে আজ কাল পরশু, এই পুরো হপ্তাটাই চাপ, এ শুক্কুরবার ক্লায়েন্ট মিট, আজকে ৮টা-৯টার আগে অফিস থেকে বেরোতেই পারবো না, তার উপরে নিউ টাউন... তুই এখনও ওখানেই আছিস, মানে নিউটাউন বাসস্ট্যান্ডের..." "না আমি তো শাপুরজি চলে এসেছি এখন, অনেক ভিতরে" "ওরে বাবা, না রে ভাই অত দুর তো সম্ভবই না, এ সপ্তাহটা বাদ দে, সামনের উইকে কর। অনেক খালি থাকবো ভাই, দরকারে এক রাত্তির থ����� যাওয়া যাবে বুঝলি" "ওহকে, তাই হবে"। এরপর কিছু অন্যান্য কথা বলার পর, হতাশ মনে ফোনটা ছেড়ে দিলাম। তারপর শুভংকর আর শৌভিকও না করে দিল। পার্থ কে তো ফোনে পেলামই না, বোধহয় নাম্বার চেঞ্জ করেছে। শেষমেষ ফুহাদ কে ফোন লাগালাম। ফুহাদের আসার চান্স কম, কারণ ওর এক ছেলে হয়েছে মাস কয়েক আগে। তাই এখন বাড়িতে সময় দেয় বেশি। প্লাস মদটদ খায় না। তবুও বললাম। ফুহাদ, "আচ্ছা চেষ্টা করব, শিওর না রে", বলে ছেড়ে দিল। তবে কি শেষটা রোহিত আমান দেরই ডাকতে হবে? ধুর! দরকার নেই। নিজেই নিজের সাথে আড্ডা দিই। ভালো ভূতের গল্পের বই আছে পড়ি আর শান্তিগোপাল আর আমি মিলে। এই ঠিক করে ফোনটা চার্জে বসাতে যাব কি একটা আনএক্সপেক্টেড ফোন এল।
"হ্যালো", "হ্যালো শ্বাশত, চিনতে পারছিস?" "কে?" "আমি সুনীতি দা বলছি"।
সুনীতি দা। একসময় যখন আমি অফিসে চাকরি করতাম, সুনীতি দা আমার ইমিডিয়েট সুপারভাইজার ছিল। সুনীতি দার সাথে আমার খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। সুনীতি দা'র তখনও বিয়ে হয়নি। আর আমার ২৬-২৭ বয়স। 
প্রায়ই বার এ গিয়ে মদ খেতাম আমরা। আমি, সুনীতি দা, রাহুল আর শঙ্কর দা। কলিগ সবাই। বেশ মজা হত। তবে সুনীতি দা আর আমি বাদ দিয়ে বাকি দুজন ভীষণ লাউফ টাইপের ছিল, তাই মাঝেমাঝে আমি আর সুনীতি দা দুজনেই যেতাম। আমাদের মধ্যে অনেক বিষয়ে কথা হত। সুনীতি দা কালচারড আর একটু ইন্টেলেকচুয়াল গোছের ছিল, তাই আমার খুব পছন্দ ছিল। আর আমাদের চয়েসও একই। দুজনেই কবিতা, ওল্ড স্কুল রক-এন-রোল আর থান্ডারবোল্ট বিয়ারের ফ্যান ছিলাম। বাদাম, পকোরা আর থান্ডারবোল্ট পেলে আমাদের রাতের ডিনার আর লাগত না। ৪-৫ প্লেট ঐ পকোরা আর বাদাম খেয়েই পেট ঠেসে যেত, সাথে ৬-৭ বোতল বিয়ার তো আছেই। মানে আমি ৩-৪ বোতলের বেশি টানতে পারতাম না, কিন্তু সুনীতি দা বিয়ার মাস্টার, গলগল করে ৬ বোতল নামিয়ে দিত অনায়াসে। সুনীতি দার ভুঁড়িটাও ছিল সেরকম। তারপর বছর দেড়েক বাদে আমি অফিস ছেড়ে দেওয়ার পর দেখা সাক্ষাৎ কমে গেল। আমি অন্য অফিসের কলিগদের সাথেই সময় কাটাতাম। সুনীতি দারও বিয়ে হয়ে গেল, বিয়ে তে ডেকেও ছিল, যেতে পারিনি। পরে দেখা করেছিলাম। খুব সুন্দরী সুনীতি দা'র বউ, দেখে মুগ্ধ হয়ে গেছিলাম। তারপর থেকে সুনীতি দা খুব রিজার্ভ টাইপের হয়ে গেল, আর আমিও ভুঁড়ি বেড়ে যাচ্ছে বলে বিয়ার মদ খাওয়া ছেড়ে দিলাম (কয়েক বছর পর, বাবা মা মারা যাওয়ার পর আবার ধরি)। তাই আস্তে আস্তে দেখা-কথা দুটোই বন্ধ হয়ে গেল। শেষ দেখা হয়েছিল বছর পাঁচেক আগে। কিন্তু আজকে সুনীতি দা'র ফোন পেয়ে উচ্ছসিত হয়ে উঠলাম। "আরে গুরু! কি খবর? নাম্বার পেলে কোথায়? কেমন আছো?" "খবর ঠিকঠাকই। তোর কি খবর?" "চলছে গুরু, বাবা মা চলে গেছেন। একা থাকি এখন।"কোথায় নিউ টাউনেই? বিয়ে করিসনি এখনও?" "না গো বিয়ে করিনি আর এখন বিয়ে করে লোক হাসাতেও চাইনা" "ধুর ছাগল, কি এমন বয়স তোর, কত লোকে আজকাল ৪০ এর পরে বিয়ে করছে, তোর তো সবে ৩৫-৩৬ হবে, তাই না?" "হ্যা, তা হবে। বউদি কেমন আছে?" "বউদি আর তোর ভাইপো ভালই আছে?" "ভাইপো?" "হ্যাঁ রে হারামজাদা, কত বছর হয়ে গেল সে খেয়াল আছে? খবরই রাখিস না বাঁচলাম না... ভাগ্যিস সেদিন সায়নের সাথে দেখা হল, ওর কাছ থেকে তোর নম্বর পেলাম।" আমি অবাক হলাম, সায়নের সাথেও তো আমার বহু বছর দেখা নেই, ওর কাছে নম্বর কি করে এল? কেউ দিয়েছে হয়ত, অনিন্দ্য, পাপুল, ফুহাদ কেউ। ওরা তো সবাই সবার সাথে যোগাযোগ রাখে, খালি আমিই পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন সকলের থেকে, বইপত্র আর কুকুর বেড়াল নিয়ে জীবন আমার। আসলে মানুষের সাথে সম্পর্ক ভালো না অনেক দিন থেকেই। বিশেষ করে মেয়েদের সাথে। যাক সে বস্তাপচা গল্প। ওতে যাব না। "আচ্ছা, তা বলো?" "তা তুই আজকে কি করছিস, মানে সন্ধ্যাবেলা, অফিস টফিসের পর?" "অফিস ত������ এখন করিনা সুনীতি দা, ফ্রিল্যান্সিং করি, বিভিন্ন কাগজে পত্রিকায় লিখি, লেখকদের বই অনুবাদ করি।" " "বাহ! বেশ তো। তা আজকে ফ্রি আছিস সন্ধ্যার সময়?" "একদম, দেখা করো" "আমি দেখা করব না, তুই দেখা করবি আমার সাথে, আমার বাড়িতে। আজকে আড্ডা দেব জমিয়ে, তোর বৌদিও বলছে তোর কথা অনেকদিন ধরে, আর আমার ছেলেকে তো তুই দেখিসইনি। চলে আয় সোজা" "লেক টাউনে যেখানে থাকতে সেখানেই আছো তো?" "হ্যা, কোথায় আর যাব! চলে আয়, বেরিয়ে পর এক্ষুনি। দরকারে রাতে থেকে যাবি" "না গো রাতে থাকতে পারব না, কারণ আমার একটা কুকুর আছে, ল্যাব, ও তো..." "ধুর ট্যাক্সি করে ওকে নিয়ে চলে আয়, না হলে একটা ওলা বা উবের ধর, আমার বাড়ি সবাই কুকুর খুব ভালোবাসে..." "আচ্ছা ঠিক আছে, রাখো, আমি দেখছি কি করা যায়"। সুনীতি দা এমন করে ডাকলো যেতে তো হবেই কিন্তু শান্তিগোপালের ব্যবস্থা করে যেতে হবে। সত্যি তো আর কুকুর নিয়ে যাওয়া যায় না। পটি-ফটি করে দিলে, কে পরিস্কার করবে?
তাই পাশের ফ্ল্যাটের এক মাসিমা কে দায়িত্ব দিলাম। উনি বিধবা এবং একা থাকেন, ছেলেমেয়েরা দুরে। প্রায়ই শান্তিগোপাল কে ডেকে নিয়ে গিয়ে আদর করেন এবং খেতে টেতে দেন। তো উনার কাছেই রেখে এলাম শান্তিগোপাল কে, যদি ইন কেস রাতে সুনীতি দা'র বাড়ি থেকে যাই। লিটার বক্সটা ওনার বারান্দায় দিয়ে গেলাম। বেরিয়ে পড়লাম অবশেষে। সুনীতি দা'র বাড়ি পৌঁছলাম যখন তখন গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পড়ছে। কিন্তু আকাশ পুরো কালো। সুনীতি দা'র বাড়িটা অদ্ভুত রকমের লাগছে, যেন মানব বর্জিত হয়ে পড়ে আছে অনেক বছর। আশে পাশে দুটো তিনটে বাড়িতেও কেউ থাকে বলে মনে হয় না। এরকম অন্ধকার বৃষ্টির দিনে একটা ধূসর কালো আকাশ কে ব্যাকগ্রাউন্ড করে বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে, যেন কোন খুব প্রাচীন এক গথিক শিল্পের নিদর্শন। ৫-৬ বছর আগে যখন লাস্ট এসেছিলাম, তখন পুরোপুরি অন্যরকম দেখেছিলাম। না স্ট্রাকচারাল কোন চেঞ্জ হয়নি। কিন্তু এই কবছরে রং চটে, দেয়ালে ফাটল ধরে, জায়গায় জায়গায় ফাংগাস আগাছা উঠে একটা পোড়ো বাড়ি পোড়ো বাড়ি মার্কা আবেদন তৈরী করেছে বাড়িটা। পাশে একটা ছোট মাঠ, অদূরে একটা জলাশয়। ধূসর আকাশের নিচে বৃষ্টিতে জল ছাপিয়ে ওঠা পানাপুকুর টাইপের লেক একখানা। এক কথায় অসাধারণ আমেজ ভূতের গল্পের আড্ডা জমানোর। খাসা! যাক, এবার ছাতা বন্ধ করে ঢোকা গেল বাড়ির ভেতরে, সুনীতি দা দরজা খুলে দিল। সুনীতি দা'কে দেখে আমি চমকে উঠলাম। "ওরে বাব্বা! ভুড়ি কমিয়ে ফেলেছো তো অনেক! চেহারা একদম চেঞ্জ!""চোপ ব্যাটা, এটা তো আমার তোকে বলা উচিৎ! আয় ভেতরে আয়!" 
ঘরে ঢুকতেই যেন ১০ ডিগ্রী টেম্পারেচার কমে গেল। এমনিতেই আজকে বাইরের টেম্পারেচার অনেক কম, ২২-২৩ হবে, ঘরের ভিতরে তো পুরো শীতকালই মনে হচ্ছে। 
"তোমার ঘরে কি ঠান্ডা গো!" "হ্যাঁ বৃষ্টিতে টেম্পারেচার নেমে যায়, তাই গেছে"।
"তা গেলেও, তোমার ঘরটা একদম কনকনে ঠান্ডা!" 
"ফ্যান অফ করে দেব?" 
"না থাক, চলুক হাল্কা করে।" 
এরই মধ্যে সুনীতি দা'র বৌ এসে গেল। আমি অপলক নয়নে চেয়ে দেখলাম। প্রতিষ্ঠা আজও একই রকম সুন্দর। ও মনে হয় আমারই বয়সি, ১-২ বছরের বড় হবে বড়জোর। 
"কেমন আছো বৌদি?" 
"হুম ভাল, তুমি? একেবারেই ভুলে গেছিলে!" "সত্যি বলতে তাই, মানে যদি ব্রুটালি অনেস্ট কথা বলি, হা হা!" 
প্রতিষ্ঠা হাল্কা হাসল। কিন্তু সুনীতি দা'র মুখটা কেমন বিষন্ন হয়ে গেল হঠাৎ। তাই দেখে প্রতিষ্ঠাও সিরিয়াস হয়ে গেল। আমি বারবার তাকিয়ে ফেলছি ওর দিকে। এবং রীতিমত তাকিয়ে থাকছি। তাই জোর করেই মাথা নিচু করলাম। কয়েক মুহুর্তের অকওয়ার্ড সাইলেন্স ভাঙল সুনীতি দা'ই। 
"যাক এখন আবার যখন আমাদের যোগাযোগ হয়েছে এতদিন বাদে, তখন পুরনো কথা থাক। কি খাবি বল?" 
খাবার দাবার এসে গেল। সুনীতি দা'র ছেলেও এল কার্টুন ছেড়ে। খু�� ���ি���ট ����েখতে। ৪ বছর বয়স। মায়ের মুখ পেয়েছে। নাম অর্ঘ্য। দেখতে দেখতে ৬ পেগ মদ খেয়ে ফেললাম সুনীতি দা'র সাথে হ্যা হ্যা হো হো করতে করতে। প্রতিষ্ঠা ছেলে কে নিয়ে অন্য ঘরে আছে। ও খায় না। দেখতে দেখতে ১০ টা বাজতে চলল। অনেক কথা হচ্ছিল সুনীতি দা'র সাথে, অনেকদিন বাদে মন খুলে কথা বললাম। সুনীতি দা'র মুখে কোন ট্যাক্স নেই, আমার এসব লোকেদের আবার খুব ভালো লাগে। যা মুখে আসে তাই বলে দেয়। কিন্তু হঠাৎ আবার একটু ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল যেন, "কি জানিস তো শ্বাশত, তোদের সাথে আড্ডাটা ভেঙে যাওয়ার পর আর কখনও সেরকম কোন দল পাতিয়ে উঠতে পারিনি। আমার মত মালদের তো আর তোর মত লেখালিখি নেই, বা নিজস্ব জগৎ বলতে কিছু নেই, বন্ধুবান্ধব আড্ডা না হলে কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। তার উপরে বাবা মা চলে গেল। তোরা কেউ যোগাযোগ রাখলি না, আর আমিও যোগাযোগ করিনি তোদের সাথে। মাঝেমাঝে মনে হত ফোন করি, কিন্তু তারপর ভাবতাম, তোদের জীবনে ইন্টারফিয়ার করা হয়ে যাবে। আফটার অল তোরা তো আমার বাল্যবন্ধু না! যদি ভুল বুঝিস! নিজের ইগোতেও হয়তো বাঁধত। যা হোক, তোদের সাথে কিছুতেই আর যোগাযোগ করা হয়ে ওঠে নি।"
"যাকগে এখন আবার হয়ে গেল, এবার মাঝেমাঝেই আবার আড্ডা হবে।"
"হ্যাঁ এখন আবার হয়ে গেল।"
"আমি নিজেও প্রচুর মিস করতাম তোমাদের জানো, কারণ আড্ডা সবার সাথে জমে না।"
"তা একবার যোগাযোগ করতে পারতি তো, হয়তো তাহলে আমার... "
কি যেন বলতে গিয়ে থেমে গেল সুনীতি দা। তারপর আবার বলল। 
"হয়তো এতগুলো বছর এইভাবে চলে যেত না।"
"ওই একই সমস্যা আমারও হয়েছিল। তুমি যোগাযোগ করনি, তাই আমি ভাবলাম আমি ব্যাচেলর ছেলে, তোমার লাইফে ইন্ট্রুড করা হয়ে যাবে, এখন তুমি হয়তো সংসারে মন দিয়েছো।"
"ধূর ব্যাটা, এই চিনলি তুই আমাকে!"
আবার মজা করা শুরু করে দিল সুনীতি দা। 
আবার প্রতিষ্ঠা এল। একটু আগে দুধ গরম করে নিয়ে যেতে দেখেছিলাম। বোধহয় ছেলেকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিল। 
"তোমাদের খেতে দিয়ে দেব এখন?"
সুনীতি দা আর আমার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করল প্রতিষ্ঠা। 
"আবার কি খাবার, এতগুলো পকোরা.."
"ধূর, রাতে কি পকোরা খেয়ে থাকবি নাকি?"
"আমার পেটে আর জায়গা নেই গুরু, তুমি খাও।""ন্যাকামি করিস না", আমাকে বলে প্রতিষ্ঠার দিকে তাকালো, "একটু পরেই খাব একসাথে, ১২-১২:৩০টা।"
"সাড়ে ১২টা? এত দেরী করে খাবে?"
"তা কি হয়েছে? প্রায়ই তো খাই, কেন তুমি কি এখন খাবে?"
"না, কালকে বুবুর স্কুল আছে তো, আমাকে তো সকালে উঠতে হবে।"
"হ্যাঁ তো ঠিক আছে, তুমি খেয়ে শুয়ে পড়ো, আমরা খাব যখন আমি বেড়ে নেব, কি আছে?"
"বিরিয়ানি পাসিন্দা আনানো আছে, মাইক্রোওয়েভ এ গরম করে নিও খাওয়ার আগে।"
"হ্যাঁ ঠিক আছে, তুমি খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ো।"আমরা দুজনে ডাইনিং রুমে বসে মদ খাচ্ছি তাই প্রতিষ্ঠা নিজের খাবারটা হাতে নিয়ে বেডরুমে বসে খেতে লাগল, সিরিয়াল দেখতে দেখতে। দরজার হাল্কা ফাঁক দিয়ে দেখতে পেলাম। 
"বৌদির অসুবিধা হবে না তো খেতে?"
"না না, ও ওরকম করে খায় সিরিয়াল দেখার সময়। আচ্ছা তুই বিয়ে করলি না কেন বলতো?"
"ভালো লাগছে না?"
"ভালো লাগছে না? তার মানে? বিয়েটা করবি তো নাকি? এখন তো কাকু কাকিমা চলে গেছেন, একা একা আর কতদিন থাকবি?"
"মনের মত পাইনি কাউকে। এখনও।"
"মেঘার সাথে এখনও... "
সুনীতি দা কে শেষ করতে দিলাম না। 
"না না, ধূসস ওর সাথে কেন কি হবে! ও তো... তুমি তো জানো, ওর সাথে সম্পর্ক সেই অফিসেই শেষ, তারপর আর কোন যোগাযোগ নেই।"
"একটা জিনিস আমাকে বলতো, তুই কি ওর জন্যই অফিসটা ছেড়েছিলি?"
"দেখো, তুমি তো জানোই আমি বরাবরই অফিস-টফিসের খুব একটা ফ্যান না।""সে ঠিক আছে, অফিসের ফ্যান আবার কে হয়, কিন্তু অফিসটা ছেড়েছিলি কেন? ওর জন্যই তো?"
"কেন ওর জন্য ছাড়ব?" জোর করে বললাম। নিজেকে���� ����ন�����������������্স করতে চেয়ে।"যাক গে ছাড়, নে আরেকটা বানা তো, আইস শেষ, এবার ঠান্ডা জল আর সোডা দিয়ে চালাতে হবে। দাড়া বোতলগুলো নিয়ে আসি ফ্রিজ থেকে।"
"একটু জল ভরে ঢুকিয়ে দাও না আইস ট্রেতে, ঘন্টাখানেকে হাল্কা হাল্কা জমে যাবে!"
"ধোস! ও নরম বরফ, ও দিয়ে কিসু হবে না, তুই বলছিস দিয়ে দিচ্ছি।" 
এই বলে ফ্রিজের দিকে এগোতে লাগল সুনীতি দা। আমি হঠাৎ খেয়াল করলাম, এতক্ষণ ঠায় একভাবে বসেছিল সুনীতি দা, প্রায় ৩ ঘন্টা হবে। আমি একবার উঠে বাথরুম গেছিলাম। সুনীতি দা আগে খুব ঘন ঘন টয়লেট যেত, এক বোতল বিয়ার শেষ করত আর টয়লেট যেত আমার মনে আছে। সেই নিয়ে আমরা খুব হাসাহাসিও করতাম। সময়ের সাথে মানুষের শরীর অনেক চেঞ্জ হয়। ব্যাপার টা নিয়ে একটা ইয়ার্কি মারতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু যা দেখলাম তাতে আমার বুকটা হঠাৎ ছ্যাঁত করে উঠল। সুনীতি দা'র কোন প্রতিবিম্ব নেই! ফ্রিজটা ঠিক ডাইনিং রুমে ফিট করা বেসিনের মুখোমুখি, বেসিনের উপরে একটা আয়না, আয়নায় খোলা ফ্রীজটার প্রতিবিম্ব পড়েছে, কিন্তু সুনীতি দা'র না। আমি বোধহয় বেশি খেয়ে ফেলেছি। আসলে অনেকদিন এত খাই না তো। একা একা কত আর খাব। আজকে গল্পে গল্পে ২ টো বিয়ার, ৬ পেগ স্কচ। আবার তাকালাম। এত নেশা হতেই পারে না! এ কি দেখছি আমি? আয়নায় দুটো বোতল শূন্যে উঠে আছে। আর এদিকে তাকাতেই দেখি সুনীতি দা, স্পষ্ট, ফ্রিজের আলোয় দেখছি। "তুই কি দিয়ে খাবি? জল না সোডা?"
আমি নিজেকে সংযত করে বললাম, "কোল্ড ড্রিংকস আছে?" আমার গলার স্বর কেঁপে উঠছে বুঝতে পারলাম। 
"হ্যাহ! থামস আপ দিয়ে স্কচ খাবি! মাথা খারাপ? হুইস্কি হলে খেতাম থামস আপ দিয়ে। তা বলে স্কচের স্বাদটা নষ্ট করবি কোল্ড ড্রিংকস মিশিয়ে? ছ্যাহ, সোডা দিয়ে খা বরং।"
"না, সোডা না, বরং জল দিয়েই..." আমতা আমতা করে বললাম।
"ওটাই বেস্ট।"
ফ্রিজের দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল নিজে থেকেই যেন। দিয়ে হঠাৎ লোডশেডিং হয়ে গেল। আমার বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠল।
"যাহ শালা!" সুনীতি দা বলল। 
আমার গলা দিয়ে একটু ক্ষীণ আওয়াজ বেরোলো। 
"মোমবাতি আছে?"  বলে বৌয়ের উদ্দেশ্যে চেঁচালো সুনীতি দা। কোন সাড়া এলো না।।"বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। ধূর কে খুঁজবে এখন মোমবাতি! এক কাজ কর না, মোবাইলগুলো আনলক করে টেবিলে রাখ। নে আমার টা ফুল চার্জ আছে।" বলে নিজের মোবাইলটা আনলক করে টেবিলে রাখল সুনীতি দা। একটা আরও অদ্ভুত পরিবেশের সৃষ্টি হলো। 
"ফ্ল্যাশলাইট জ্বা..লব?"
"ও কতক্ষণ জ্বালিয়ে রাখবি, চার্জ শেষ হয়ে যাবে! বরং স্ক্রিনটাই অন থাক, এখন গেল কখন আসবে কে জানে? এক কাজ কর, ডিস্পলেটা ৩০ মিনিট করে দে। তাহলে জ্বলে থাকবে।" 
আমি কাঁপা কাঁপা হাতে সেটিংস এ গিয়ে ডিস্পলে টাইম আউট ৩০ মিনিট করলাম আর ব্রাইটনেস ফুল করে দিলাম।"হ্যাঁ দে এবার, এটাকে এইখানটা দাঁড় করিয়ে রাখি, তাহলে ঘরে আলো হবে।"
মোবাইলটাকে একটা তাকে রাখবে বলে হাতটা বাড়ালো সুনীতি দা। আমার হাতে হাতটা হাল্কা ঠেকতেই যেন ঠান্ডার ছেঁকা লাগল। কি বরফ ঠান্ডা আর শক্ত সেই হাত। অপার্থিব ছোঁয়ায় আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা হিমের স্রোত বয়ে গেল। আমি তাকিয়ে দেখলাম ফ্যাকাশে সাদা সেই হাতের দিকে। সুনীতি দা এমনি খুব ফর্সা কিন্তু ভূতুড়ে সাদা আর ফর্সার তফাৎ খুব স্পষ্ট। আমার বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ পেল। শরীরে যেন রিগর মরটিস। একফোঁটা নড়তে পারছি না।

প্রতিষ্ঠার খাওয়া হয়ে গেছে। ও রান্নাঘরে গিয়ে থালাটা রেখে, বেসিনে হাত ধুয়ে চলে গেল আবার ঘরে। 
কোন ঘরে বড় আলো জ্বলতে দেখিনি আসার পর থেকে। এখনও ছোট আলোটাই জ্বলছে। নীলচে আলোয় আর বাইরে ক্রমাগত বৃষ্টির শব্দতে একটা মায়াবী পআমি স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বললাম, "এরকম কি যায় তো..মাদের এখানে?" 
"না রে, কিন্তু আজকে ভালো বৃষ্টি হয়েছে তো, কোথায় কি হয়ে������� লা��ন��! তোর কি গরম লাগছে? ইনভার্টারটারও ব্যাটারি গেছে..."
"না না ধূর। গরম কোথায় আবার?"
"তাহলে একটু দাঁড়া, এক্ষুনি চলে আসবে।"
সুনীতি দা স্বাভাবিকভাবেই কথা বলছে দেখে কনফিউজড হয়ে গেলাম যে ওটা চোখের ভুল নাকি। তার উপরে ফাটাক সে কারেন্টটা চলে যাওয়ায়, একটু চমকে গেছিলাম। তাই...আসলে তো ভয়ে থেকেই ভূতের উৎপত্তি, উল্টোটা নয়। কিন্তু স্রেফ চোখের ভুলের জন্য শরীর এরকম ঠান্ডা বরফ হয়ে যাবে? আর ওর ঠান্ডা হাতটা? চোখের সাথে সাথে চামড়ারও ভুল হচ্ছে। 
মনে মনে এসব ভেবে চলেছি। ওদিকে আবার যথারীতি কথা শুরু হলো। যথাসম্ভব স্বাভাবিকভাবে কথা বলার চেষ্টা করে গেলাম।রে  "আচ্ছা, তুমি কি এখন কি করছো সেটা তো বললে না? ওখানেই আছো তো নাকি? তা এখন তো নিশ্চই প্রোমোশন-টোমোশন পেয়ে এলাহি ব্যাপারস্যাপার, শালা স্কচ ছাড়া কথাই বলো না হ্যাঁ!" বলে জোর করে হাসলাম।
গ্লাস থেকে কর্কশভাবে এক ঘোঁট টেনে মুখটা ভেটকে সুনীতি দা মাথা ঝাঁকাল। 
"ন্যা! এখন কিছু করিনা।"
"মানে? বিজনেস শুরু করেছো নাকি নিজের? হ্যাঁ ঠিক ধরেছিলাম, তুমি শালা এক নম্বরের ছুপা রুস্তম, কি ব্যবসা করছ বলো?"
"ধূর ধূর, ওসব কিছু না রে। বেশ কয়েক বছর আমি কোন কিছুর মধ্যেই নেই রে।"
"মানে? ধ্যার, ইয়ার্কি মেরো না!"
নিজের পেগটা শেষ করে একটা সিগারেট ধরাতে গেলাম। ঠিক তো, এতক্ষণ বসে আড্ডা মারছি আর একটাও সিগারেট খাইনি। নিজেরটা বের করে সুনীতি দা'কে অফার করলাম। 
"আমি খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি রে। আর তুই জ্বালাবি তো, দাঁড়া।"
"কিছু লাগবে না, লাইটার আছে আমার কাছে।"
"না আমার আসলে লাইটারের তেল বা দেশলাইয়ের গন্ধেও সমস্যা হয়।"
"হ্যাঁহ! সে কি?""হ্যাঁ রে। তুই খেয়ে নে, আমি একটু ঘুরে আসছি।"
"কোথায় যাবে তুমি?"
"ওই একটু ওপরের ঘর থেকে। বোস তুই, খা।"
"ওহো তোমার অসুবিধা হয় জানলে আনতাম না, আচ্ছা একটাই খাব।"
"না না ধূর, তুই খা না যত খুশি। আমি আসছি ঘুরে।"

সুনীতি দা উঠতেই লাইটার ধরালাম। ধরিয়ে সিগারেটটা জ্বালাতে জ্বালাতে সুনীতি দা'র দিকে তাকালাম।সুনীতি দা পিছন ফিরে চলে যাচ্ছে, সিড়ি দিয়ে উঠছে। লাইটার আর মোবাইলের আলোয় স্পষ্ট দেখলাম যেন ভেসে ভেসে সিঁড়ি দিয়ে উঠে যাচ্ছে সুনীতি দা। হে ভগবান! আমার মুখ থেকে সিগারেটটা পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। আর কি রে, কতভাবে নিজেকে বোঝাবো যে এসব কিছুই হ্যালুসিনেশন! মদ আমি নতুন খাচ্ছি না, জীবনে কোনদিন এরকম হয়নি। কিন্তু এ কি করে হতে পারে?  কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকলাম, সিগারেটটা হাতেই জ্বলছে। হঠাৎ জেদ চেপে গেল। দুটান মেরে উঠে দাঁড়ালাম। সুনীতি দা'র মোবাইলটা হাতে নিয়ে, "সুনীতি দা", বলে হাঁক পেড়ে গেলাম সিঁড়ির দিকে। উঠতে থাকলাম সিঁড়ি দিয়ে।"সুনীতি দা!" কোন সাড়াশব্দ নেই। উপর তলায় এলাম। কেউ নেই। সম্পূর্ণ ফাঁকা আর বহুকাল ধরে মানববর্জিত থাকার গন্ধ। দম আটকে এলো। পুরো দোতলাটাই যেন একটা গুদাম ঘরের মত। অনেক আসবাব, হাবিজাবি জিনিসের ডাঁই। সমস্ত জানালা দরজা বন্ধ। হে ভগবান! তাহলে কি সত্যি...ভাবতে না ভাবতেই একটা ঘরে নজর পড়ল। আমার সমস্ত মাথা পুরো শাটডাউন হয়ে গেল। দেখি সেই ঘরে ঝুলছে সুনীতি দা'র মালা পড়ানো ছবি! আমার হাত থেকে সিগারেটটা পড়ে গেল। আরেক হাতে শক্ত করে চেপে ধরলাম সুনীতি দা'র মোবাইলটা। হঠাৎ মনে হলো, পিছনে কেউ যেন দাঁড়িয়ে আছে। পিছন ফিরে দেখি সুনীতি দা। মোবাইলটা তুলে সোজা মুখে মারতেই সুনীতি দা একটু পিছিয়ে গেল। "কি রে, ভয় পেয়ে গেলি?"
"না...তোমার ছবিতে মালা..."
"হুমম, মরে গেছি। তাই।"
"সুনীতি দা...আ আমা..."
"ভয় নেই। ঘাড় ফাড় মটকাবো না।" বলে মুচকি হাসল সুনীতি দা। "আমি মরে গেছি ঠিকই কিন্তু তোর কোন ক্ষতি করব না। চিন্তা করিস। ক্ষতি করার হলে এতক্ষণ তোর সঙ্গে বসে মদ খেতাম না।"���������� হঠাৎ খুব ���াথা গরম হয়ে গেল। "এ কি ধরণের ইয়ার্কি সুনীতি দা! এতদিন বাদে দেখা হলো, আমার এসব একদম ভালো লাগে না!"
"কেন তুই তো খুব ভূতের গল্পের ফ্যান, আজ তো বন্ধুদের ডেকে ভূতের গল্পের আসরই বসাবার প্ল্যান করেছিলি হা হা হা!" 
কি করে এটা জানা সম্ভব সুনীতি দা'র পক্ষে? আমি তো একবারও বলিনি!
"কিন্তু তা বলে এরকম প্রাকটিকাল জোক!"
"জোক না। তোর এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না নাকি? ঠিক আছে, তাহলে ওই লাইটারটা একবার জ্বালা, দিয়ে দেখ কি হয়।"
আমি ফটাস করে লাইটার জ্বেলে ধরলাম সুনীতি দা'র মুখের উপর। সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য হয়ে গেল সুনীতি দা। এ কি হচ্ছে আমার সঙ্গে? পুরোটাই কোন স্বপ্ন নয় তো? এরকম ভূতের স্বপ্ন আমি বহু দেখেছি জীবনে। এক সময় রাতে ঘুমোতে ভয় পেতাম ভূতের স্বপ্ন দেখব বলে, দিনে ঘুমোতাম ক্ষেপে ক্ষেপে। কিন্তু আজ যা হচ্ছে...আমি বহু বছর একাই থাকি, কুকুর নিয়ে, কোনদিন তো...
আঙুলের চাপ অজান্তেই ছেড়ে গিয়ে লাইটার নিভে গেল। সঙ্গে সঙ্গে পিছন থেকে সুনীতি দা'র গলা। "কি রে, বিশ্বাস হলো? না তুই স্বপ্ন দেখছিস না।"
আশ্চর্য আবারও না জানার কথা জেনে গেছে সুনীতি দা, আমি মনে মনে কি ভাবছি কি করে ধরল ভূত না হ"কিন্তু এটা কি করে সম্ভব সুনীতি দা, মানুষ কি কখনো ভূত হতে পারে? তুমি ভূত হলে এতক্ষণ আমার সঙ্গে বসে ড্রিংক করল কে?"
"আমিই করলাম।"
"কিন্তু ভূত মানে তো সূক্ষ্মদেহি, সূক্ষ্ম দেহে স্থুল বস্তু কি করে ঢোকা সম্ভব?"
"হুমম ঠিকই ধরেছিস, ওটা মায়া।"
"মায়া? মানে?"
"মানে আমি সত্যি খাইনি কিছুই। কিন্তু তুই দেখেছিস যে আমি খাচ্ছি। ওটা আমাদের, মানে ভূতেদের পক্ষে এমন কিছু ব্যাপার না।"
"কিন্তু আজকের যুগে কি করে ভূত থাকতে পারে...মানে এত সায়েন্স টেকনোলজির যুগে..."
"ধূর গাধা! তোরা না পারিসও বটে! যুগ বদলে গেলেই সত্যি বদলে যায়! আমরা ছিলাম, আমরা আছি, আমরা থাকব। তুইও মরে গেলে ভূত হবি। অন্তত কিছু সময়ের জন্য। প্রত্যেকটা মানুষই মরার পর তার রূহটা কিছুক্ষণের জন্য ইহজগতে অপেক্ষমাণ থাকে। তারপর কারুর ওপরের দরজা খুলে যায় তাড়াতাড়ি, আর কারুর দেরিতে। এই দুই জগতের মধ্যে আটকে থাকা সময়টাকেই লোকে আমাদের ভূত বলে।""তার মানে তুমি কতক্ষণ আগে মরেছো?"
"ক্ষণ না...কাল। বছর বল বছর।"
"বছর? কত বছর?"
"সে তোদের হিসেবে প্রায় বছর দুই হবে।"
"আর তোমার বৌ...তোমার ছেলে...ওরাও কি তবে ভূত?"
"না রে, ওরা তোর মতই। জীবিত মানুষ।"
"সুনীতি দা, আমার মাথাটা পুরো লিকুইড হয়ে যাচ্ছে, আমি আর নিতে পারছি না!"
"ওদের জন্যই তো আমি এই ভূতজগৎ ছেড়ে যেতে পারছি না রে! দীর্ঘদিন এই জগতে আটকে থাকা মানে পুরো নরক জানিস? যারা বেশিদিন আটকে থাকে, তারা আর বেরোতে পারে না। বছরকে বছর আটকে থাকে আর উৎপাত করে। কিন্তু কি করব, ওদের ছেড়ে কোথায় যাব? প্রতিষ্ঠারও সেরকম কেউ নেই আত্মীয় পরিজন। আর আমার ছেলেটা...তাই দু'বার এই নিয়ে পরপারের ডাক ফিরিয়ে আটকে পড়ে আছি এই মধ্যিখানে। কেউ নেই এখানে জানিস, কেবল শূণ্যতা, কেবল একাকীত্ব - সবই আছে, কিন্তু কিছুই আমার নয়, কোন কিছুকেই ধরতে পারি না।""কিন্তু তুমি মরেছিলে কি করে?"
"আর বলিস না। খুব লজ্জাজনক মৃত্যু। অতিরিক্ত মদ্যপান ধূমপানের ফলে স্ট্রোক। বউ সেদিন বাপের বাড়ি গেছিলো। আর আশেপাশে প্রতিবেশি তো কেউ নেই, তাই বেঘোরে প্রাণটা হারাতে হলো। আমাকে ফোনে না পেয়ে পরেরদিন সকালে এসে দেখে আমি মরে পড়ে আছি। কিন্তু মরে গেলেই হবে? তার পরেও খরচাপাতি আছে! আমি তো না হয়ে মরে কেটে পড়ব, কিন্তু তারপর ছেলেটার কি হবে? আর বউটারই বা কি হবে? ওকে দেখতে সুন্দর হলেও বড় ইন্ট্রোভার্ট স্বভাবের। কেউ আবার বিয়ে না দিলে সারা জীবন এমনিই কাটিয়ে দেবে। আর ওর নিজের বলতে শুধু ওর অসুস্থ বুড়ি মা, আমার শ্বা����ড়ি����� 

"তার মানে ওরা...ওরা এত সহজে মেনে নিল? ভূতের সঙ্গে থাকা? তোমার বউ মেনে নিল ভূত স্বামীর সাথে বাস? তো..মার ছেলে জানে ওর বাবা ভূত।"
"নাহ! সহজে কি কিছু হয়! বিশেষত এসব জিনিস। প্রথমদিন ভয়ে ভির্মি খেয়ে গেছিলো দুজনে। তারপর অনেক করে বোঝালাম যে আমি ওদের নিজের লোক, ওদের কোন ক্ষতি করব না। তারপর আস্তে আস্তে বিশ্বাস অর্জন করলাম। প্রতিষ্ঠাকে আর বাবুকে আগলে আগলে রাখতাম, সব সময় সাথে সাথে থাকার চেষ্ঠা করতাম। কোন বিপদআপদের আশঙ্কা থাকলে সাবধান করে দিতাম। প্রখর সূর্যের আলোয় আমাদের থাকা সম্ভব না, তাই সূর্য ডোবার প্রতিক্ষা করতাম রোজ, ওদের কাছে পাওয়ার জন্য। প্রথম প্রথম ও বাপের বাড়ি গিয়েই কাটাতো আর আমি এখানে একা একা কাউন্ট ড্রাকুলার মত এই বিশাল বাড়িতে ঘুরে বেড়াতাম। তারপর ওর মা মারা গেল বছর খানেক আগে, সেই থেকে ও আর সেরকম যায় না বাপের বাড়ি। কারণ আর তো কেউ নেই সেখানে। সেই বাড়ি বেচবে বেচবে করে শেষ পর্যন্ত ইন্টারনেটে এড দিয়ে একজন খদ্দের জোগাড় হয়েছিল। কিন্তু সেই লোকটার শয়তানি মস্তিষ্ক। একা মহিলা দেখে সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছিল বহুভাবে। কিন্তু আমি হতে দিইনি। এইভাবে প্রায় দু'বছর কেটে গেল রে। এবার আমাকে যেতেই হবে, না হলে আর ডাক আসবে না একশ বছরে, এখানেই আটকে থাকতে হবে। সে বড় ভয়ানক একাকীত্ব রে। সেই জন্যই আজ তোকে ডাকা।" 

**ই ও প্রায়ই
 কে দেখতে যেত বাপের বাড়ি। এত একাকি জীবন আমাদের সকলের...কেউ কোথাও নেই যেন! শালা ঘরের মধ্যে মরে পড়ে থাকলাম, কেউ খবরটা পেলো না! তাই ঠিক করলাম, না, আমার দশা ওদের হতে দেব না। ওদের কিছু একটা ব্যবস্থা না করে যাব না। তাই বিগত দেড় বছরের উপর ওদের দেখাশোনা করে যাচ্ছি। একাউন্টে যা টাকা ছিল তাই দিয়ে চলছে কোনভাবে ওদের দুজনের। ও এখন টিউশানি করে, টুকটাক রোজগার হয়।"লে?চ
েষ্টা করে ে� না " হয়।"


"আমি? আমি কি ভাবে কি করব? আমি তো ভূত জগৎ সম্বন্ধে কিছুই..."
"ধূর! অনেক কষ্টে তোর নম্বর জোগাড় হয়েছে জানিস। প্রতিষ্ঠার সাথে সায়নের দেখা হয় গত পরশুদিন সন্ধ্যে ৮ টা নাগাদ, বিগ বাজারে। কেউই কাউকে চিনত না। আমিই প্রতিষ্ঠাকে বলি যে ও আমার বন্ধ আর তোরও। ওর কাছ থেকেই তোর নাম্বারটা নিতে। সায়ন এখন বিগ বাজারে কি ম্যানেজার না কি। যাইহোক প্রতিষ্ঠা নিজেকে ইন্ট্রডিউস করতেই সায়ন আক্ষেপ করে আমার মৃত্যুর।তারপর কাকে কাকে ফোন করে তোর নাম্বারটা জোগাড় করে দেয়। খুব ভালো ছেলে। তারপর আজকে অবশেষে তোকে ডেকে পেলাম।"
"কিন্তু তুমি ভূত হয়ে মোবাইলে কল কি করে করলে? এসব কি হচ্ছে সুনীতি দা, আমি তো..."
"আছে আছে। সব ব্যবস্থা আছে। ভূতেরা হলো, হিন্দিতে যাকে বলে জুগার মাস্টার বুঝলি? আমরা সব ব্যবস্থা করে নিতে পারি দরকারে। আমরা যেমন দরকার স্থুলদেহিদের মত দরকারে জিনিসপত্র ধরতে বা তুলতে পারি, তেমনি ফোনে কথাও বলতে পারি। যাক গে শোন, মূল ব্যাপারটা হোলো আমার যাওয়ার সময় হয়ে গেছে, তাই এবার তোকেই ওদের দায়িত্বটা নিতে হবে।"
"মানে? আমি কি করে.."
"আমি তোকে জোর করতে পারি না। কিন্তু আমি খুব ভালো করেই জানি যে তুই প্রতিষ্ঠাকে মনে মনে লাইক করিস। আর আমার ছেলেকেও তো তোর ভালোই লেগেছে। তো কি বলিস? তুই কি প্রতিষ্ঠাকে বিয়ে করে আমাকে মুক্তি দিবি ভাই?"আমি তো এতটাই টেকেন এব্যাক পুরো ব্যাপারটায় যে আমার মুখ দিয়ে কিছুই বেরোচ্ছে না। তার উপরে ভূতে দিচ্ছে তার বউকে বিয়ে করার প্রস্তাব, হাসব না কাঁদব?
"দেখ আমি জানি তুই বলবি যে তোর কোন সেভিংস নেই, লিখে যা রোজগার করিস তা তোর একার পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু আর দুজনের খরচ তুলতে পারবি না।"
"তুমি তো সবই জানো.."
"না এটা জানি না, আন্দাজ করছি। যেহেতু তুই বলেছিলি চাকরি ছেড়ে ফ্রীল্যান্সিং করছিস তাই। যাইহোক, আমার যা সেভিংস আছে তাতে আর প্রতিষ্ঠার বাপের বাড়ি বেচে যা হবে, তাতে একটা ভালো টাকাই দাঁড়াবে। আর তুই ইচ্ছে হলে তো শাপুরজির ফ্ল্যাট ছেড়ে এখানেও চলে আসতে পারিস। এই বাড়িটা আমার বাবার বানানো, এখন এটা লিগ্যালি প্রতিষ্ঠার। ও তোর নামে করে দেবে না হয়।"
"না না, তুমি জানোই সুনীতি দা, আমার এসব বস্তুর লোভ নেই। বাড়ি গাড়ির মোহ নেই বলেই চাকরি ছেড়ে ফ্রীল্যান্সিং করছি আর অনাড়ম্বর কিন্তু স্বাধীন একটা জীবনযাপন করছি।"

"তাহলে তোর উত্তর কি? বিয়েটা তুই করবি না করবি না? সোজাসুজি বল। দেখ আমার হাতে সময় কম। ওদের কিছু একটা ব্যবস্থা না হলে, আমি পরপারে গিয়েও শান্তি পাবো না। যারা পরজন্মে যাওয়ার আগে পূর্বজন্মের টান ছাড়তে পারে না, তাদের নতুন জীবনও খুব যাতনাময় হয়। এটা অবশ্য জীবিতকালে কোথায় কোন মহাপুরুষ বা পরাতত্ত্ববিদের মুখে শুনেছিলাম।"
হঠাৎ দেখি সিঁড়ি বেয়ে প্রতিষ্ঠাও উঠে এসেছে। ও আসতে না আসতেই ছাদ থেকে একটা প্রচন্ড সাদা আলো ঘরময় ছড়িয়ে পড়া শুরু হলো। আমরা চোখ ঢাকার চেষ্টা করলাম। 
সুনীতি দা বলে উঠল, "এই দেখ, এরা একমুহুর্ত অতিরিক্ত দেবে না। যেই দেখেছে তুই মোটামুটি রাজি, অমনি..."
আমি কোনভাবে দেখার চেষ্টা করলাম। সাদা আলোটা ততক্ষণে পুরো ঘর সাদা করে দিয়েছে। চোখ সম্পূর্ণ ধাঁধিয়ে যাওয়ার আগে লক্ষ্য করলাম যে সুনীতি দা'র সূক্ষ্মদেহটা উর্দ্ধগগনে সাদা আলোয় মিলিয়ে যাচ্ছে। শেষ কথা সুনীতি দা বলল, "আমার ছেলেটাকে ভালো রাখিস শ্বাশত ভাই!"হঠাৎ সাদা আলোটা বুজে গেল, পুরো ঘর ঘুটঘুটি অন্ধকার। মোবাইলটা নিবে গেছে। আনলক বাটনে চাপ দিয়ে জ্বালিয়ে দেখলাম প্রতিষ্ঠা আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কি আশ্চর্য! একটা সামান্য ভূতের গল্পের আড্ডা দিতে গিয়ে, ভূতের সঙ্গেই আড্ডা দিলাম একটা সন্ধ্যে। এবার ভূতের বউকে বিয়েও করতে হবে...

























Comments

Popular posts from this blog

মাকড়সা

বসুন্ধরা